টিপাই মূখ আরেকটা ফারাক্কা |
|
|
|
| Sunday, 11 December 2011 04:02 |
|
টিপাই মূখ আরেকটা ফারাক্কা Read more
আন্তর্জাতিক আইনের সর্বোচ্চ লঙ্ঘন করেছে ভারত : আসিফ নজরুল বিঘ্নিত হবে হাওরের হাজার কোটি টাকার বোরো আবাদ: ম. ইনামুল হক টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুত্ কেন্দ নির্মিত হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোসহ দেশের সামগ্রিক পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন দেশের পানি ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। ভারত যাতে জলবিদ্যুত্ কেন্দ নির্মাণ না করে সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে ভারত সরকার যাই বলুক না কেন এ বাঁধ এ অঞ্চলের জলবায়ুর উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবাহ হ্রাস পাবে আর কিছু অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে যেমন নদীতে পলিমাটি জমে নদীর গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করবে অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে হাওরের পানি না সরার কারণে বিশাল এলাকার বোরো চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারত টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের চুক্তি করে আন্তর্জাতিক আইনের সর্বোচ্চ লঙ্ঘন করেছে। প্রতিবেশী ভাটির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখে চুক্তি করার পর বাংলাদেশ সরকার উপযুক্ত প্রতিবাদ করেনি বলেও সমালোচনা করেন তারা। এদিকে, সমপ্রতি টিপাইমুখ ইস্যুতে দেশজুড়ে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় ভারত সরকারের আমন্ত্রণে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুই উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও ড. মশিউর রহমান জানান যে, টিপাইমুখে জলবিদ্যুত্ কেন্দনির্মিত হলে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে না। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে না জানিয়ে চুক্তি করায় ভারত সরকারের বিদ্যুত্ মন্ত্রী ক্ষমাও চেয়েছেন বলে জানান ড. গওহর রিজভী। কিন্তু সরকারের দুই উপদেষ্টার কথাতে শান্ত হয়নি দেশজুড়ে চলা বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের প্রতিবাদ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হরতাল, আন্দোলন,মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ বন্ধ হয়নি। চলছে অব্যাহতভাবে। এমনকি ভারতের মণিপুর রাজ্যে এ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে সেদেশের পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুরে, বরাক নদীর ওপরে টিপাইমুখ বাঁধ ও জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের জাতীয় জলবিদ্যুত্ নিগম, মণিপুর সরকার ও আরও একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা একটি যৌথ উদ্যোগের কোম্পানি গঠন করেছে। গত ২২ অক্টোবর তারা যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি সই করে। এরপর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে বরাক নদের ওপর টিপাইমুখ বাঁধ ও জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য যদিও এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশের পর থেকেই বাংলাদেশ আপত্তি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশের আপত্তির মুখে ২০১০ ও ২০১১ সালে প্রতিবেশী দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে যুক্ত ইশতেহারে মনমোহন সিং বলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় টিপাইমুখে এমন কোন পদক্ষেপ নেবে না ভারত। কিন্তু বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখেইে এ বাঁধ নির্মাণে চুক্তি করা হয়েছে। এমনকি নতুন যৌথ কোম্পানি তৈরির আগেই ভারতের সীমান্তবর্তী সড়ক নির্মাণকারী আধাসামরিক বাহিনী বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন উক্ত এলাকায় একটি জরিপ চালায়। যার ভিত্তিতে টিপাইমুখ প্রকল্প তৈরিতে ভারী যন্ত্রপাতি বহন উপযোগী রাস্তা আর সেতু নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে বাঁধের জলাধার সংলগ্ন জাতীয় মহাসড়কটি ডুবে গেলে কোথা দিয়ে নতুন রাস্তা বা সেতু তৈরী হবে, সেগুলোর পরিকল্পনাও করছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ বাঁধ হবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য ‘ফারাক্কা’। টিপাইমুখে বাঁধ বা জলবিদ্যুত্ কেন্দ যাই নির্মাণ করা হোক না কেন বাঁধের উজান ও ভাটিতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ভাটি অঞ্চলে প্লাবন সমভূমি বিনষ্ট, মত্স্যসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর চলাচল ও বংশবিস্তার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা, ভারত জলাধার নির্মাণ করে নিজের সুবিধা অনুযায়ী পানি ধরে রাখবে এবং শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য নদীর পানি প্রবাহ বাড়াবে। এতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে নদীতে পানি থাকলে উপকার হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশের ফসলি জমি বিনষ্ট হয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, ভারতের দিক থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, টিপাইমুখে যে জলবিদ্যুত্ কেন্দ নির্মিত হচ্ছে এতে বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবে না। কারণ হিসাবে ভারত জানিয়েছে, এ জলবিদ্যুত্ কেন্দ নির্মাণ করতে গিয়ে নদীর পানি অন্য কোন খাতে প্রবাহিত করা হবে না এবং নদীর প্রবাহ আগের মতই একই ধারায় বজায় রাখা হবে। সেইসঙ্গে ভারত এও বলেছে যে, বাংলাদেশ যেভাবে মনে করে সেভাবে টিপাইমুখ জলবিদ্যুত্ কেন্দ বিষয়ে জরিপ চালাতে পারে কিংবা যৌথ জরিপেও তাদের অনাগ্রহ নেই। আমি বিশেষজ্ঞ নই কিন্তু সেখানকার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি যে, টিপাইমুখে কোন সেচ প্রকল্পের জন্য বাঁধ নয়, জলবিদ্যুত্ কেন্দ তৈরি করা হবে। নদীর পানিকে অন্য দিকে প্রবাহিত করা হবে না। আর জলাধার নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যে নদীর প্রবাহ ঠিক রাখা হবে। এর ফলে নদীর পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে না বলেও ভারত জানিয়েছে। তিনি বলেন, ভারত জানিয়েছে বাংলাদেশ যদি ইচ্ছা করে তবে এ জলবিদ্যুত্ কেন্দে র অংশীদারিত্ব পেতে পারে। তিনি আরো বলেন, দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা যদি তথ্য উপাত্ত নিয়ে দেখান যে, এ জলবিদ্যুত্ কেন্দ বাংলাদেশের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে তবে বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতকে প্রতিবাদ জানানো হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পানি আইন অনুসারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা সুরাহার পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে ভারত সরকার যাই বলুক না কেন এ বাঁধের প্রভাবে জলবায়ুর উপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবাহ হ্রাস পাবে আর কিছু অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বাংলাদেশের ফসল উত্পাদন বাধাগ্রস্ত হবে, মত্স্য আহরণ হ্রাস পাবে, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাব নিয়ে কোন জরিপ নেই। কিন্তু দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বাঁধ ও জলবিদ্যুত্ কেন্দে র প্রভাব পর্যালোচনা করে এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশের ক্ষতি কোন অংশে কম হবে না। এখন জরিপ হলে এটা বোঝা যেত যে, ক্ষতির পরিমাণ কতটা হবে। পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে যে ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ পড়তে যাচ্ছে সে ক্ষতির দিকে সরকার দৃষ্টিপাত করছে না। ভারত সরকার শীতকালে নদীতে পানি বৃদ্ধির বিষয়টিকে বড় করে দেখাতে চাইছে। কিন্তু শীতকালে পানি বৃদ্ধি পেলে সিলেট ও নেত্রকোনার হাওরে যে বোরো ধানের আবাদ নষ্ট হয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বোরো আবাদ থেকে বঞ্চিত হবে—এটি কেউ নজরে আনছে না। ম. ইনামুল হক আশংকা প্রকাশ করে বলেন, এই বাঁধ নির্মাণের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা,অর্থনীতি ও প্রাণীবৈচিত্র্যের ওপর তাত্ক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হবে। টিপাইমুখ বাঁধ চালুর আগে যখন জলাধারটি পূর্ণ করা হবে তখন স্বাভাবিকভাবে এর ভাটিতে পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হবে। যা ঐ অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও তার ভারসাম্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। মত্স্য প্রজননে ফেলবে বিরূপ প্রভাব। ইনামুল হক আরো জানান, সমুদ্র সমতল থেকে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার গড় উচ্চতা মাত্র ৬ থেকে ১২ মিটার। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে নিম্নাঞ্চল। এখানে বৃষ্টিপাতের ধরন কিছুটা ভিন্ন হলেও অন্যান্য অঞ্চলের মত শীতের সময় বৃষ্টিপাত খুব কম হয়। স্বাভাবিকভাবেই তখন জলাভূমিগুলোতে পানি সমতল নিচে নেমে যায়। অনেক জলাভূমি একেবারে শুকিয়ে যায়। এই সুযোগে তখন নিচুভূমিতে উচ্চ ফলনশীল বোরো আবাদ হয়। বোরো ফসলকে রক্ষা করার জন্য এই অঞ্চলের অধিকাংশ হাওরগুলো কম উচ্চতার বাঁধ দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে। বোরো হাওরের একমাত্র ফসল এবং কয়েক কোটি মানুষের জীবনযাপনের প্রধান অবলম্বন। বছরের বাদ বাকি সময়ে কৃষির বদলে হাওরে মাছ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পানি আইন বিশেষজ্ঞ আসিফ নজরুল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোন দেশ অভিন্ন নদীর উজানে কোন কাঠামো নির্মাণ করতে চাইলে অবশ্যই তার ভাটির জনপদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, টিপাইমুখে ভারত বাঁধ নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করলেও এখন পর্যন্ত এই বাঁধের ক্ষতিকর দিক, লাভ-লোকসান বা কোন জরিপ ও জলবায়ুর ওপর কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে কোন যৌথ সমীক্ষা হয়নি। বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখে জলবিদ্যুত্ নির্মাণের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ আশা করেছিলাম। আসিফ নজরুল বলেন, ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও গঙ্গা চুক্তির নয় নম্বর আর্টিকেল পুরোপুরি লংঘন করে এ চুক্তি করেছে। তারা যে কোম্পানি গঠন করছে এটাও বাংলাদেশকে জানায়নি। এটা আন্তর্জাতিক পানি আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। কারণ আইন অনুযায়ী সমতা, ন্যায্যতা বজায় রেখে ক্ষতির কারণ হবে না—দু’দেশ যখন এমন অবস্থানে পৌঁছাবে তখন এ ধরনের বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু ভারত একতরফাভাবেই এ বাঁধ নির্মাণ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে না জানিয়ে কেন ভারত টিপাইমুখে জলবিদ্যুত্ কেন্দ নির্মাণের কাজে হাত দিল—এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে কোন আলোচনা হয়েছে কি? এ প্রশ্নের জবাবে ড. গওহর রিজভী ইত্তেফাককে বলেন, ‘ভারতের বিদ্যুত্ মন্ত্রী এ জন্য আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা ভুলবশত হয়েছে। এরপর থেকে বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।’ বর্তমানে ভারত এই বাঁধ নির্মাণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এনেছে। নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পথে। বাংলাদেশে উজান থেকে আসা পানির ৭ থেকে ৮ শতাংশ আসে ভারতের বরাক নদী থেকে। মত্স্য সম্পদ আহরণ ও চাষাবাদের জন্য বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ বরাক নদীর পানি প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় প্লাবনভূমির পরিমাণ ৬০ ভাগ এবং ভরা মৌসুমে অন্তত ২২ ভাগ হ্রাস পাবে। টিপাইমুখ ড্যাম আর ফুলেরতাল ব্যারেজ নির্মাণের ফলে অমলসিধের কাছে বরাকের পানিপ্রবাহ ভরা মৌসুমে অন্তত ২৫ শতাংশ হ্রাস পাবে, সেই অনুসারে পানি সমতলও ১ দশমিক ৬ মিটার নেমে যাবে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে বরাকের প্রবাহ অন্তত ৪ দশমিক ২ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং পানি সমতল বৃদ্ধি পাবে প্রায় ১ দশমিক ৭ মিটার। এই অবস্থা সুরমা ও কুশিয়ারার প্রবাহকেও একইভাবে প্রভাবিত করবে। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলে সেচ ও নাব্যতার কাজে সুবিধা হবে কিন্তু কোন কোন অঞ্চল থেকে পানি নিষ্কাশনের প্রক্রিয়াটি ধীর হয়ে যাবে। ভরা মৌসুমে পানি প্রবাহ হ্রাস আর শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে আপাতদৃষ্টিতে তাকে সুবিধাজনক বলে মনে হলেও দুটি বিষয় আরো গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ টিপাইমুখ বাঁধ, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কিলোমিটার উজানে ভারতের বরাক নদীর ওপর নির্মিতব্য একটি বাঁধ। টিপাইমুখ নামের গ্রামে বরাক এবং টুইভাই নদীর মিলনস্থল। এই মিলনস্থলের ১ হাজার ৬০০ ফুট দূরে বরাক নদীতে ৫০০ ফুট উঁচু ও ১ হাজার ৬০০ ফুট দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্য নিয়ে ভারত সরকার কাজ শুরু করেছে। এর নির্মাণ ব্যয় ১ হাজার ৭৮ কোটি ভারতীয় রুপি। পুরো প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ১শ ৬৩ কোটি ভারতীয় রুপি। বহুমুখি প্রকল্পটির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মূলত বরাক উপত্যকায় পানি ধারণের মাধ্যমে ২ হাজার ৩৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ। পরবর্তী সময়ে এই বাঁধের মাধ্যমে সম্ভাব্য জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এক নজরে বরাক অববাহিকা বরাক নদীটি ভারতের মনিপুর রাজ্যের কাছার পর্বতে উত্পন্ন হয়ে মনিপুর, আসাম, মিজোরামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অমলসিধের কাছে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বরাকের উজানের অংশটি ভারতের আসাম ও মনিপুর রাজ্যে বিস্তৃত। আর এর ভাটির প্লাবন সমভূমি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সুরমা অববাহিকা বাংলাদেশের সিলেট এবং সুনামগঞ্জের পূর্বাংশে বিস্তৃত। ভারতের জৈন্তা ও খাসিয়া পাহাড়ে উত্পন্ন জালুখালি, নোয়াগাঙ, সারি-গোয়াইন, লাবাচ্ছড়া প্রভৃতি এই অববাহিকার অন্যান্য নদী। উল্লেখযোগ্য হাওরের মধ্যে আছে পাথারচলি, বারো, বালাই হাওর। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা দুটি কুশিয়ারা অববাহিকার অন্তর্গত। সোনাই,জুরী, মনু, খোয়াই নদীগুলো ত্রিপুরা পর্বতে উত্পন্ন হয়ে এই অববাহিকায় প্রবাহিত। উল্লেখযোগ্য হাওরের মধ্যে রয়েছে হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, দামরীর, হাইল, মাকার হাওর। সুরমা বরাকের শাখা নদী হলেও শুষ্ক মৌসুমে সুরমার প্রবাহ খুব কম থাকে বলে এটি বরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বরাকের প্রায় পুরো প্রবাহ তখন কুশিয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়। অমলসিধে বিভক্ত নদী দুটি হবিগঞ্জের মারকুলির কাছে পুনরায় মিলিত হয়ে কালনী নামে প্রবাহিত হয়েছে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে কালনী ঘুরঘাটা নদীর সাথে মিলিত হয়ে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। বরাক নদীর ভারতে প্রবাহিত অংশের দৈর্ঘ্য ৪৯৯ কিলোমিটার। অন্যদিকে কুশিয়ারা, কালনী এবং পরে মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ৪০৩ কিলোমিটার। বরাক বাংলাদেশের প্রধানতম নদী মেঘনার সাথে সরাসরি যুক্ত বলে বরাকের গুরুত্ব অনেক বেশি। বরাক উপত্যকার ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থা টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। বরাক উপত্যকার নিচে চ্যুতিটি বরাক ও এর অন্যান্য শাখা-প্রশাখার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে। প্রস্তাবিত বাঁধটির অবস্থান তাইথু চ্যুতির উপর, যা ভূ-তাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় এবং ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের কেন্দ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভূ-তত্ত্ববিদগণ। এছাড়া, সঞ্চরণশীল ভূ-ত্বকীয় প্লেট (ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেট) এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। রিখটার স্কেলে ৭-এর বেশি মাত্রার অন্তত দুটি ভূমিকম্প টিপাইমুখের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে অনুভূত হয়েছে গত ১৫০ বছরে। যার মধ্যে ১৯৫৭ সালে সর্বশেষটির উপকেন্দ ছিল টিপাইমুখ থেকে মাত্র ৭৫ কিলোমিটার দূরে। ইন্দো-বার্মা রেঞ্জে টেকটনিক প্লেটের সঞ্চারণের ফলে এ অঞ্চলে মাটির অল্প গভীরে উত্পন্ন ভূমিকম্পের প্রবণতা বেশি। |
| Last Updated on Sunday, 11 December 2011 04:44 |




